দীর্ঘদিন পর প্রাণ ফিরল সেই চেনা শ্রেণিকক্ষে
দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর পর স্কুলে ফিরল শিক্ষার্থীরা। রোববার দেশের স্কুল-কলেজ খুলে দিলে সকাল থেকেই একটা সাজ সাজ অবস্থা দেখা গেছে স্কুলগুলোতে।
সকাল সাড়ে ৭টা, সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পরে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিন পর সশরীরে ক্লাসে বসার আনন্দ তাদের চোখে-মুখে। কলেজ কর্তৃপক্ষক সমউচ্ছ্বাসে তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে নিচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে একে একে সবাইকে ঢোকানো হয়েছে শ্রেণিকক্ষে। করোনা সংক্রমণের কারণে টানা ৫৪৩ দিন বন্ধ থাকার পর শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়েছে শিক্ষাঙ্গন।
আজ রোববার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে রাজধানীসহ সারাদেশের স্কুল-কলেজে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শুরু হয়েছে সশরীরে একাডেমিক কার্যক্রম।
রাজধানীর একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে, ক্লাস চালু হওয়ায় শিক্ষক- শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস। তবে এ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে অভিভাবকের মধ্যে কিছু শঙ্কাও দেখা গেছে। বিদ্যালয় কৃর্তপক্ষ অভিভাবকদের অভয় দিয়ে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীদের স্কুলে পাঠানোর পরামর্শ দিচ্ছে।
সকাল থেকেই রাজধানীর অন্যতম ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের ভিড়। সময়ের আগে অনেকেই চলে যায় স্কুলের ফটকের সামনে।
সেখানে অভিভাবকদের সঙ্গে, আবার দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়া সহপাঠীদের সঙ্গে গল্প করছে।
ফটক খুলে দেয়ার পর তারা গিয়ে নিজেদের আসনে বসে। তবে তাদের সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বসতে দেখা গেছে। সবার মুখেই ছিল মাস্ক।
রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও দেখা গেছে একই চিত্র। সেখানেও শিক্ষার্থীরা মাস্ক পরে ও অন্য সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাসে ফিরেছে।
রাজধানীর বাড্ডার শাহাজাদপুর এলাকায় কয়েকটি স্কুল ঘুরে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের পদচারণ। সকাল থেকেই শিক্ষার্থীদের তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে স্কুলে আসতে দেখা গেছে।
স্কুলগুলোর ফটকে কোথায় কোথায় শিক্ষার্থীদের শরীরের তাপমাত্রা মেপে তারপর প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে। রাখা আছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার।
কয়েকটি স্কুলে দেখা গেছে, ফটকসহ ক্লাসরুমগুলোও সাজানো হয়েছে বাহারি রঙের বেলুনে।
দীর্ঘদিন পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পা রেখেই আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে শিক্ষার্থীরা। সবারই চোখে-মুখে ছিল খুশির ঝিলিক।
স্কুল প্রাঙ্গণ আবারও মুখরিত চিরচেনা সেই পরিবেশে। যেখানে শিক্ষার্থীরা আবার সশরীরে ক্লাসে অংশ নিচ্ছেন আর শিক্ষকরাও পাঠদান করছেন। এ নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার চোখে-মুখেই ছিল খুশির ঝিলিক। তবে এ আনন্দের সঙ্গে অভিভাবকদের আছে উদ্বেগও।
দীর্ঘ ১৭ মাস পর স্কুল খোলার প্রথম দিনে নানা উৎসব-আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিতে দেখা গেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে।
রাজধানীর একাধিক স্কুলে গিয়ে বেলুনসহ নানা উপকরণ দিয়ে সাজাতে দেখা গেছে। স্কুলে শিশু-কিশোররা যেন নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান করে, সেজন্য করিডোরে দাগ দিয়ে দেয়া হয়েছে।
সরকারের নির্দেশনা
স্কুল-কলেজ খুলতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় একাধিক নির্দেশনা দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপারে বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের শরীরের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা এবং যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করা; শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা; প্রথম দিন শিক্ষার্থীরা কিভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করবে এবং বাসা থেকে যাওয়া-আসা করবে সে বিষয়ে শিক্ষণীয় ও উদ্বুদ্ধকরণ ব্রিফিং করা; শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সঠিকভাবে মাস্ক (সম্ভব হলে কাপড়ের মাস্ক) পরিধান নিশ্চিত করা; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব ওয়াশরুম নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং পর্যাপ্ত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা; স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষকদের সমন্বয়ে পর্যবেক্ষণ ও নিশ্চিতকরণ কমিটি করা অন্যতম।
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছি। উপজেলার সব স্কুলে তামপাত্রা মাপার যন্ত্র কেনা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মাস্ক পরে স্কুলে আসতে বলা হয়েছে। যদি কারো মাস্ক না থাকে তাহলে স্কুল থেকে ওই শিক্ষার্থীকে মাস্ক দেওয়া হবে। আমরা এখন শিক্ষার্থীদের বরণ করে নেওয়ার অপেক্ষায় আছি।’
যেভাবে চলবে ক্লাস
২০২১ ও ২০২২ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সপ্তাহের ছয় দিন ক্লাস করবে। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম ও একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা শুরুতে সপ্তাহে এক দিন আসবে। নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের কোন শ্রেণির কবে ক্লাস তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষই ঠিক করবে। আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোন শ্রেণির কবে ক্লাস, তা ঠিক করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। বন্যাকবলিত জেলা ও উচ্চ মাত্রার করোনা সংক্রমণ এলাকার স্কুল খোলার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।